মাnরাতুল মাষ্টার।

হ্যালো। আজ এক অসাধারন মায়ের গল্প বলবো। সব মা ই অসাধারন। তবে আমাদের সামনে এমন কিছু মা অসাধারন হয়ে আসেন যা অনেকটা কল্পনার মত। এই সব মা হতে পারেন আমাদের অনুপেরনা, হতাশার অন্ধকারের দিশা। যাই হোক আমি গল্পে চলে যাচ্ছি।nএই মায়ের প্রতি সম্মান রেখে আমি উনার নাম বলতে চাচ্ছি না। এই মা কে আমি আমার মা হিসেবেই ধরে গল্পটা শুরু করছি।n

Cover artwork for মাnরাতুল মাষ্টার।
SHORT STORIES

আমাদের পরিবারে মা আসেন আজ থেকে বিশ বছর আগে। বাবা হোমিওতে চিকিৎসায় হাত দিয়েছেন মাত্র। দশ সদস্যের একটা যৌথ পরিবারের বাবা স্বল্প আয়ের ঐ পরিবারের এক জন পালক সদস্য। সদ্য ম্যাট্রিক পাস করা মা এই পরিবারে এসেই আইয়েতে ভর্তির আবদার করেন। বাবার ইচ্ছে থাকলেও পরিবারের বিপক্ষে যেয়ে মাকে ভর্তি করাতে পারলেন না। বড় সংসারের সুগৃহিনী হয়ে পরিবার জীবন শুরু করলেন। সংসার জীবনের শুরুতেই দাদাজান গত হলেন। দাদাজানের চলে যাওয়ার সাথে সাথে সংসারের অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গেল। বাবা যে এই পরিবারের পালক সন্তান, মা জানতেন না। কিছুই বুজে ওঠার আগে চাচারা আমাদেরকে আলাদা করে দিলেন। দাদিজান রাগ করে চাচাদের সাথে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তখন আমি সহ পরিবারে চার জন। লাকড়ি রাখার ঘরটিকে আমাদেরকে থাকতে দেয়া হয়। বাবা পাঁচ-ছয় দিন চেষ্টা করে ওই খুপরিটাকে দুই আংশে ভাগ করে কোন রকম ভাবে থাকার জায়গা করে নেন। সংসার চলছিলও অভাব আর মার দু'চোখ ভরা অশ্রু জলে।
হঠাৎ এক দিন গ্রামের উকিল চাচা বাবার কাছে একটা উইল পত্র নিয়ে আসলেন। দাদাজান বাবার জন্য অল্প কিছু জমি উইল করে রেখে গেছেন। সমাজের মোড়লরা বসে চাচাদের থেকে জমি গুলো বাবার নামে করেদেন। জমি হারিয়ে চাচারা আমাদের উপর আরো বিরক্ত হয়ে গেল। আমাদেরকে একদম সহ্য করতে পারতেন না। দেখতে দেখতে আমার আরো তিন ভাই পৃথিবীতে এসে পরিবারের সদস্য হল। জমি থেকে আসা ধান বাবার চিকিৎসালয় থেকে আসা অর্থে আমাদের ভালই চলছে। আমি এইট এ, আলো ফাইভে, মানিক টুতে আর রতন তখনো মায়ের কোলে। রাতে তাড়াতাড়ি ফিরে বাবা আমাদের সবাইকে নিয়ে পড়তে বসতেন। আমাদের পড়া দেখিয়ে দিয়ে বাবা মোটা মোটা হোমিও বই পড়তেন। এভাবেই এক দিন পড়া শেষ করে ঘুমিয়ে, ভোর রাতে কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে শুনি বাবার হার্ট অ্যটাক। সকাল হতে হতেই আমরা চার জন এতিম হয়ে গেলাম।
বাবা নেই, যেন কিছুই নেই। কান্না, চিৎকার কোন কিছুতেই প্রাণ ঠান্ডা হচ্ছিলো না। হঠাৎ মা শক্ত হয়ে উঠলেন। আমাদের সবাইকে বুকে জড়িয়ে অনেক কান্নাকাটি করে কান্না থামিয়ে বেঁছে থাকার লড়াই নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন।
চাচারা জমিগুলো দখল পাওয়ার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠলেন। মা আইনের আশ্রয় নিলেন। দাদাজান একটা স্কুলকে কিছু জমি দান করেছিলেন। স্কুল কমিটি আরো কিছু জমির প্রয়োজন দেখাল। মা, তাদের প্রয়োজন মত জমি ভোগ দখলের অনুমতি দিল। ঐ স্কুলে আলো,মানিক পড়ে। তারা খুবিই খুশি হল। বাবা স্কুল কমিটির যেই পদে ছিলেন,মাকে সেই পদের সদস্য করা হল।
বাবার চিকিৎসালয় বন্ধ, বই আর মেডিসিন গুলোর স্থান হল আমাদের পড়ার রুমে। দাদাজানের উইলে আমরা তিনটা বড় পুকুর পেয়েছিলাম। ওগুলো থেকে প্রতি বছর লাক্ষ খানেক টাকা আসে। মা ঐ টাকার উপর নির্বর করে সংসার চালাচ্ছেন।
আমি এস,এস,সি দিবো, মাকে নিয়ে শহরে কিছু প্রয়োজনীয় বই আর স্টেশনারি কিনতে গেলাম। কেনা-কাটা শেষে, মা বলল একটু উনমুক্ততে যাবেন। নিয়ে গেলাম। মা পত্রিকা দেখে আগেই জেনে নিয়েছিলেন উনমুক্ততে তখন এইস,এইস,সিতে ভর্তি চলছে। আমাদেরকে লজ্জায় বলতে পারেননি। আমি বুজতে পেরে মাকে ভর্তি করে দিলাম। ফ্রি বই দিল। সব নিয়ে বাসায় চলে আসলাম। মা পুরো দমে আমাদের সাথে পড়া-লিখা শুরু করলেন। স্কুল কমিটির অনুরোধে গেস্ট টিসার হিসেবে ক্লাস নেয়া শুরু করলেন। মা সব কিছু নিয়ে এত ব্যস্ত যে দম নেয়ারও টাইম নেই। কিন্তু অল্প দিনেই সব কিছু সামলে নিয়েছেন।
চাচারা মামলায় হেরে সমাজপ্রতিদের পদ লেহনের আশ্রয় নিলেন। তাদের পদ লেহনে কাজ হল, আমাদেরকে একঘরে করে দিল। কিন্তু সমাজের উপর মানুষের নির্বরতার প্রয়োজন কমে যাওয়ায় আমাদের কোন কষ্টই হয়নি।
আমার মাধ্যমিকের সময় মার উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষ শেষ। আমাদের গুলো তাজা মাথা, মার টা অনেক দিনের অব্যবহৃত। রেজাল্ট একটু খারাপ হওয়ায় বললেন আর পড়বেন না। আমরা সবাই বেঁকে বসলাম, আমরাও পড়বো না। সব শেষে আমাদের পড়া-লিখা আবার শুরু। আমার মাধ্যমিকের আগে মার উচ্চ মাধ্যমিক শেষ। আমাদের খুশির যেন আর কমতি থাকেনা।
মাঝে আলো অসুস্থ ছিল। ওর জন্য মার অনেক কাঠ-খড় পুড়াতে হয়েছে। আলোর অসুখের জন্য মা বাবার সব হোমির বইগুলো পড়ে ফেললেন। আলোর চিকিৎসাও হল মার হাতেই। একটু সময় লেগেছে, কিন্তু আলো পুরো-পুরি সুস্থ হয়েগেছে।
একদিন মা, আমাকে বলল হোমিওর কিছু ওষুধ এনে দিতে। শহর থেকে অনেক খুঁজে জার্মানির ওষুধ এনেদিলাম। মা বিনা পয়সায় গ্রামের গরিব বাচ্চাদের শরিরে গোটা রোগের ওষুধ দিতেন। মার রোগি ছিল উনার স্কুলের গরিব বাচ্চাগুলো। মার চিকিৎসা বিদ্যা ভালোই কাজ করছে। গ্রামে তখন অনেক গর্ববতি মহিলা ছিল। তাদের জন্যও মা বিনা পয়সায় ওষুধ দিতেন, কারো কারো কাছে ওষুধের দাম টা নিতেন। নতুন অনেক গরিব রোগিরা নতুন নতুন রোগ নিয়ে আসতে শুরু করল। মা তাদের প্রথম কোন ওষুধ না দিয়ে, রোগ গুলো নিয়ে অনেক পড়তেন, তার পর সম্ভব হলে দিতেন, না হলে অন্য ডাক্তার দেখানোর জন্য বলতেন।
দেখতে দেখতে আমি বড় হয়ে গেলাম। ভার্সিটিতে পড়ি। আলো মাধ্যমিক শেষ করে কলেজে। কলেজে ভর্তির সময় মা সাথে এসেছিলেন। আলো মাকে তখন উনমুক্ততে বি,এ তে ভর্তি করিয়ে দিলেন।
মানিক রতনকে নিয়ে গ্রামে মা পড়া-লিখা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর চিকিৎসাও খারাপ চলছে না। আমি আর আলো শহরে। খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তাল সামলানোর জন্য মা কিছু জমি বিক্রি করেদেন।
আমার মাষ্টার্স শেষ, আলো তড়িৎ বিদ্যা নিয়ে পড়ছে। মানিক এইটে ট্যালেন্টফুল পেয়ে মাধ্যমিকেও অনেক ভাল করে শহরে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে, রতনের সামনে মাধ্যমিক। ওদের ভাল রেজাল্ট হলে অনেক ভাল লাগে, তবে মা যেই দিন বি,এ পাস করে ফেললেন, কি যে ভাল লেগেছিল, আমি বলে বুঝাতে পারবো না। মার গ্রামের সব রুটিন আমি শেষ করে দিয়ে যাচ্ছি। নরওয়েতে একটা ভাল জব নিয়ে চলে যাচ্ছি। মাকে কোন ভাবে শহরে থাকতে রাজি করাতে পারছিলাম না। সব শেষে শহরে আলোদের সাথে মাসে দশ দিন থাকতে রাজি হয়েছেন, বাকি বিশ দিন গ্রামে। মা তাঁর গরিব রুগী গুলোর সেবা না করে শহরে পড়ে থাকার মানে খুঁজে পাননা।
মা আমার জন্য দোয়া করো, তোমাদের আদর্শে যেন পথ চলতে পারি। তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসি। নিজের যত্ন নিও। আমি চললাম।


#ShortStories #UrbanFiction #Storytelling #FlashFiction
Next 2-Minute Read The Old Radio of Matunga East Read Next Story →
Read smoothly in WritOn
Open App